Madhyamik Bengali Suggestion 2027 (Wbbse Class 10)(প্রবন্ধ রচনা)
Madhyamik Bengali Suggestion 2027 (WBBSE Class 10)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) ২০২৭ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের জন্য বাংলা প্রথম ভাষার সম্ভাব্য এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ রচনার সম্পূর্ণ তালিকা নিচে দেওয়া হলো। পাঠ্যবই ও সাময়িক বিষয়াবলি অনুশীলনের পাশাপাশি এই নির্বাচিত প্রবন্ধগুলি প্রস্তুত করলে পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর তোলা সহজ হবে।
মাধ্যমিক বাংলা সাজেশন ২০২৭: সম্পূর্ণ অধ্যায়ভিত্তিক প্রস্তুতি নির্দেশিকা
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE 2027) মাধ্যমিক পরীক্ষায় বাংলা একটি অন্যতম প্রধান ও বেশি নম্বর তোলার মতো বিষয়। সঠিক পরিকল্পনা, প্রশ্নকাঠামো বোঝা এবং বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও প্রবন্ধগুলো নিয়মিত অনুশীলন করলে বাংলায় ৯০ শতাংশের বেশি নম্বর পাওয়া কঠিন নয়। নিচে পাঠ্যক্রমের প্রবন্ধ রচনা বিভাগ থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধাবলির বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো।
সেরা প্রস্তুতি কৌশল: মাধ্যমিক বাংলা পরীক্ষায় ভালো নম্বরের জন্য সেরা প্রস্তুতি নির্দেশিকা। গল্প, কবিতা, নাটক, ব্যাকরণ ও প্রবন্ধ রচনার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং নম্বর তোলার সহজ কৌশল জানুন এখানে।
মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চা, বইমেলা, দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান, পরিবেশের ভূমিকা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় সংক্রান্ত প্রবন্ধাবলি বিশেষভাবে প্রস্তুত রাখুন।
মাধ্যমিক বাংলা: অন্যান্য সমস্ত অধ্যায়
প্রবন্ধ রচনা (মান – ১০)
ভূমিকা: শিক্ষার ক্ষেত্রে মাতৃভাষার কোনো বিকল্প নেই। শুধু শিক্ষা নয়, সৃজনধর্মী চিন্তায়, গবেষণায় মাতৃভাষার ব্যবহার যেভাবে অনুকূলতা সৃষ্টি করে তার তুলনা মেলা ভার। পৃথিবীর যে সমস্ত দেশ জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রভূত উন্নতিসাধন করেছে, লক্ষ করলে দেখা যাবে, তাদের অনুশীলনের মাধ্যম মাতৃভাষা।।
অতীতে মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চার সুযোগের অভাব: উচ্চশিক্ষার বাহন হিসেবে আমাদের মেনে নিতে হয়েছিল ইংরেজিকে। আমাদের বিজ্ঞানচর্চারও মাধ্যম ছিল তাই ইংরেজি। নিজের ভাবনা নিজের ভাষায় ব্যক্ত করার মধ্যে যে স্বাচ্ছন্দ্য থাকে, একটি বিজাতীয় ভাষায় তা সম্ভব নয়। ভাষা-শিক্ষার সংকটে পড়ে অনেক মেধাবী বাঙালি শিক্ষার্থীর প্রতিভার বিকাশ ঘটত না।।
বাংলায় বিজ্ঞানচর্চা এখনও উপেক্ষিত: শিক্ষাক্ষেত্রে মাতৃভাষার মর্যাদা অনেক বেড়েছে। মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষাদানের ব্যাপারটিও অনেক ক্ষেত্রে মেনে নেওয়া হয়েছে। তবু কার্যক্ষেত্রে মাতৃভাষায় বিজ্ঞান-অনুশীলনের প্রসঙ্গটি এখনও উপেক্ষিত রয়ে গেছে। বলা হয়ে থাকে, বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলি চর্চা করার মতো বই এবং পরিভাষা বাংলায় নেই। সেইসঙ্গে এও বলা হয়ে থাকে যে, বিজ্ঞানের মতো একটি আন্তর্জাতিক বিষয়ের চর্চা বাংলাতে হলে তা জগৎবাসীর কাছ থেকে দূরেই থেকে যাবে। কিন্তু প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ অনেক কিছুই তৈরি করে নেয়। বই এবং পরিভাষার ক্ষেত্রেও সেই গবেষণা যে ভাষাতেই হোক না কেন, ভাষান্তরের মাধ্যমে খুব সহজেই পৃথিবীতে ছড়িয়ে যেতে পারে।।
বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার নিদর্শন সত্ত্বেও অনীহার অবসান হয়নি: ফরাসি, জার্মান, জাপানি, রুশ প্রভৃতি ভাষায় বিজ্ঞানের চর্চা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, জগদানন্দ রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা প্রমুখের কিছু কিছু রচনায় বৈজ্ঞানিক ভাবনা যেভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে, তাতে বুঝতে পারি বাংলা ভাষাও বিজ্ঞানের ভাবনা ও সূত্র প্রকাশ করতে সক্ষম। এটাও স্বীকার্য যে, বাংলা ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবান পূর্বসূরিদের প্রয়াস সত্ত্বেও বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি।।
উপসংহার: এই যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা আমরা দূর করতে পারি। তার জন্য প্রয়োজন আন্তরিক সংকল্প আর সমবেত উদ্যোগ।।
ভূমিকা: সভ্য মানুষের জীবনে অপরিহার্যরূপে জড়িয়ে গেছে বই। লিপি আবিষ্কারের পর থেকে মানুষ তার অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা কিংবা অনুভূতিগুলিকে ধরে রাখতে চেয়েছে বইয়ের মধ্যে। ক্রমে ক্রমে বইয়ের মুদ্রণ এবং প্রকাশনার ক্ষেত্রে অনেক সমৃদ্ধি ঘটেছে। গড়ে উঠেছে ছোটোবড়ো অজস্র গ্রন্থাগার, বই নিয়ে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যেরও একটি ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। সংস্কৃতি, জ্ঞানচর্চা আর বাণিজ্যের সেই মেলবন্ধনেই সৃষ্টি হয়েছে বইমেলার।।
বইমেলার উদ্দেশ্য: বইমেলার প্রথম উদ্দেশ্য হল, প্রকাশক এবং পাঠকের মধ্যে প্রত্যক্ষ একটি সংযোগ গড়ে তোলা। প্রকাশকরা পাঠকসমাজের প্রবণতা ও চাহিদা উপলব্ধি করার সুযোগ পান বইমেলায়। অন্যদিকে পাঠকরাও প্রকাশকদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পান। দ্বিতীয়ত, পাঠকরা বিভিন্ন স্টলে ঘুরে ঘুরে নিজেদের রুচি ও পছন্দ অনুযায়ী বই বাছাই করতে পারেন। যে-বইয়ের কথা কোনোদিন হয়তো জানা যেত না, সেইরকম কোনো প্রয়োজনীয় বইও হয়তো এখানে পেয়ে যেতে পারেন কোনো পাঠক। তৃতীয়ত, বইমেলা মানুষকে বই পড়তে ও বই ভালোবাসতে শেখায়। পুস্তকপ্রেম সমাজকে সুস্থ রাখার পক্ষে বিশেষ সহায়ক। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, "একটা সভা উপলক্ষে যদি দেশের লোককে ডাক দাও, তবে তাহারা সংশয় লইয়া আসিবে, তাহাদের মন খুলিতে অনেক দেরি হইবে— কিন্তু মেলা উপলক্ষে যাহারা একত্র হয় তাহারা সহজেই হৃদয় খুলিয়াই আসে— সুতরাং এইখানেই দেশের মন পাইবার প্রকৃত অবকাশ ঘটে"। বইমেলা সম্পর্কেও এই কথা প্রযোজ্য। বইমেলাতেই দেশের পাঠকসমাজের মন পাওয়ার 'প্রকৃত অবকাশ ঘটে'।।
পশ্চিমবঙ্গের বইমেলা: পশ্চিমবঙ্গের বইমেলা বলতে প্রথমেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কলকাতা বইমেলার ছবি। কলকাতায় বইমেলার সূচনা হয় ১৯৭৫ সালে। প্রকাশক এবং পুস্তক বিক্রেতাদের প্রচেষ্টায় শুরু হয় এই মেলা। ২০০০ সালে কলকাতা বইমেলার রজত জয়ন্তী বর্ষ উদযাপিত হয়। প্রতি বছর শীতকালে, মোটামুটিভাবে ২৫ জানুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। ছোটো-বড়ো-মাঝারি সবরকম প্রকাশনা সংস্থা হাজির থাকে এই মেলায়। ভিন্ন দেশের প্রকাশকরাও আসেন। আর আসেন দেশের নানান প্রান্ত থেকে পুস্তকপ্রেমিক মানুষ। তবে বইমেলা কেবল আর কলকাতাতে সীমাবদ্ধ নেই, বইমেলা ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যেকটি জেলায়। এখন প্রতি বছর জেলায় জেলায় একটি বড়ো উৎসব হল বইমেলা।।
বইমেলার সাফল্য: জেলা বইমেলা এবং কলকাতার বইমেলায় গ্রন্থপ্রেমী মানুষের ভিড় উপচে পড়ে। বইমেলায় এই স্বতঃস্ফূর্ত জনসমাগম বইমেলার সাফল্যের কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। বইমেলাও মানুষের একটি মহামিলনের ক্ষেত্র। এখানে জাতি-ধর্ম-বিত্ত নির্বিশেষে মানুষ মিলিত হয়; এখানে একাকার হয়ে যায় গ্রাম ও শহর।।
উপসংহার: মন ও মননের চর্চার উপযুক্ত সঙ্গী বই। বই মানুষের পরম বন্ধু। মানুষের শিক্ষা ও সংস্কৃতির উৎকৃষ্ট নিদর্শন এই বইকে নিয়ে মেলার আয়োজন নিঃসন্দেহে মানুষের প্রগতিশীলতার পরিচায়ক। দিকে দিকে এবং দিনে দিনে বইমেলার গ্রহণযোগ্যতা যত বাড়ছে ততই মনে হচ্ছে, মানুষ সত্যিই আলোকপথের যাত্রী। অজ্ঞানতার অন্ধকার ভেদ করে সে পেতে চায় জ্ঞানের আলো। আমরা চাই বইমেলা আরও সমৃদ্ধ হোক, আরও আকর্ষণীয় হোক। মানুষ আরও বেশি করে বই পড়ুক আর বই কিনুক।।
ভূমিকা: মানুষের কল্যাণের জন্য বিজ্ঞানের আবির্ভাব। মানুষ নিজের প্রয়োজনে বিজ্ঞানের নিত্যনতুন আবিষ্কার ঘটিয়ে চলেছে। প্রতিদিনের জীবনে আজ বিজ্ঞানই মানুষের একমাত্র ভরসা। মহাকাশ থেকে পাতাল— সর্বত্র বিজ্ঞানের জয়যাত্রা চলেছে।।
দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞানের ব্যবহার: একশো বছর আগেও মানুষের দৈনন্দিন জীবন এত সুখকর ছিল না। এখন সকালে আমাদের ঘুম ভাঙায় অ্যালার্ম ঘড়ি। তারপর দাঁত মেজে পাম্পে তোলা বা টিউবওয়েলের জলে মুখ ধুয়ে হাতে তুলে নিই এক কাপ গরম চা, যা অনেক বাড়িতেই গ্যাস-ওভেনের সাহায্যে প্রস্তুত হয়। এরপর খবরের কাগজ পড়ে অথবা দূরদর্শন বা বেতারের মাধ্যমে দেশ ও পৃথিবীর নানা সংবাদ পাই। মাথার ওপর চলে বৈদ্যুতিক পাখা, কোনো ঘরে থাকে বাতানুকূল ব্যবস্থা। টেলিফোন কিংবা প্রয়োজনে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কথা হয় বহুদূরে থাকা মানুষের সঙ্গে। কম্পিউটারে খবর ও ছবি আসে ইন্টারনেটের মাধ্যমে। অসুখ করলে ডাক্তার দেখিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ওষুধের ব্যবস্থাও করা যায়। স্নানের জন্য যেমন ওয়াটার হিটার গরম জল সরবরাহ করে, তেমনি ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা জল বা বরফ নিয়ে কোল্ড কফিও খেতে ভালো লাগে। ফ্রিজে তো কতদিনের তৈরি রান্না রেখে খাওয়া যায়। স্কুল, কলেজ, অফিসের জন্য বাস, ট্রাম, ট্যাক্সি, গাড়ি, অটো, ট্রেন তো রয়েছেই; জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার জন্য লরিও রয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের জন্য বই, খাতা, পেন, কম্পাস, ল্যাবরেটরির সরঞ্জাম, ব্ল্যাকবোর্ড ইত্যাদি বহু সুবিধা বর্তমান। বাসস্থানের জন্য বহুতল বাড়ি, লিফট বা এস্কেলেটর রয়েছে। অসুস্থ হলে যেমন অ্যাম্বুলেন্স আছে, তেমনি মৃত্যুর পর শববাহী গাড়িও আছে। প্রেক্ষাগৃহে বসে চলচ্চিত্র দেখে আমরা মুগ্ধ হতে পারি। চিকিৎসার জন্য যেমন হাসপাতালে যেতে পারি, তেমনি আগুন নেভাতে দমকলও চলে আসে দ্রুত। শল্যচিকিৎসা আমাদের অনেক মানসিক উদ্বেগ কমিয়ে দিয়েছে। এইভাবে বিজ্ঞানের নিত্যনতুন আবিষ্কার সুখে ভরিয়ে তুলেছে আমাদের দৈনন্দিন জীবন। দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান হয়ে উঠেছে আমাদের পরম আত্মীয়।।
উপসংহার: বিজ্ঞান মানুষকে সর্বস্ব দিতে চায়, কিন্তু বিজ্ঞানের অপব্যবহারে মানুষ বিপর্যস্ত। নানান মারণাস্ত্র, সাধারণ বোমা, পারমাণবিক বোমা, ডিনামাইট ব্যবহার, খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণ ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষের ক্ষতি করার নিত্য প্রচেষ্টা চলছে। দোষ বিজ্ঞানের নয়, তাকে কে কীভাবে প্রয়োগ করছে সেটাই বিবেচ্য। কুসংস্কার দূর করে, বিভেদকামী মনোভাব ও সংকীর্ণ স্বার্থপরতা ত্যাগ করে মানুষের মনে শুভবুদ্ধির উদয় হলে দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞানের ব্যবহার ও ভাবনা সার্থকতা লাভ করবে। বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু লিখেছেন— "যে-কোনো জাতির পক্ষে আজ বিজ্ঞানকে তুচ্ছ করা কিংবা তার সম্ভাব্যতাকে অবহেলা করা একান্ত বিপজ্জনক। সাময়িক ইতিহাসের সঙ্গে যাঁর পরিচয় আছে তিনি একথা স্বীকার করবেন"।।
মাধ্যমিক বাংলা: অন্যান্য সমস্ত অধ্যায়
ভূমিকা: বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি সত্ত্বেও প্রকৃতির কাছে আজও মানুষ অসহায়। যে অকুতোভয় মানুষ বাতাসের ভিতরে সাঁতার কেটে অনায়াসে আকাশে ওড়ে, কিংবা সমুদ্রের তলদেশে নির্ভয়ে অভিযান চালায়, তারই জীবন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় ঝড়ের তাণ্ডবে কিংবা বন্যার ভয়াবহতায়। লড়াই জারি থাকলেও প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণই মানবসভ্যতার অনিবার্য নিয়তি।।
দুর্যোগের নানা চেহারা: প্রাকৃতিক দুর্যোগ নানাভাবে মানবসমাজে আসে। বন্যা, খরা, ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত, ধস, ভূমিক্ষয় এবং নানা সামুদ্রিক ঝড় ইত্যাদি নানা চেহারায় দুর্যোগ প্রত্যক্ষ করা যায়। সামুদ্রিক ঝড়ের আবার নানান রূপ— টর্নেডো, হ্যারিকেন, সুনামি ইত্যাদি। রূপ যাই হোক, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানেই ধ্বংস, বিনষ্টি আর জীবনহানি। ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থাকে একক শক্তিতে তছনছ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে এক একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ।।
দুর্যোগের প্রভাব: প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবকে বিজ্ঞানী এবং সমাজতাত্ত্বিকরা বেশ কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথমত, ব্যবহারিক ক্ষতি অর্থাৎ মানুষের এবং অন্যান্য প্রাণীদের প্রাণহানি বা অনিষ্ট। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক ক্ষতি— মানুষের বাসস্থান নষ্ট হওয়া, ফসলহানি, যোগাযোগ ব্যবস্থার বিপর্যয়, ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ধ্বংস ইত্যাদির মধ্য দিয়ে যা ঘটে। তৃতীয়ত, পরিবেশের ক্ষতি— বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বিনষ্টির সম্ভাবনা। চতুর্থত, ভাবগত বিপর্যয়— প্রাকৃতিক বিপর্যয় ব্যক্তিজীবনকে জীবিত অবস্থাতেও বিপর্যস্ত করতে পারে। সমীক্ষায় দেখা গেছে বিপর্যস্ত এলাকার বহু মানুষই বেঁচে থেকেও নিঃস্ব হয়ে 'Post Traumatic Stress Disorder'-এর শিকার হন।।
বিপর্যয়— কিছু তথ্য: প্রতিবছর পৃথিবীর নানা প্রান্তে কোনো না কোনো বিপর্যয় ঘটে যায়। শুধু ভূমিকম্পেই পৃথিবীতে গড়ে ১০০০০ মানুষ প্রতিবছর মারা যান। বন্যার কারণে পৃথিবীতে ৩ ট্রিলিয়ন ডলার আর্থিক ক্ষতি হয় প্রতিবছর। ২০১০ সালে হাইতির ভূমিকম্পে দু-লক্ষেরও বেশি মানুষ মারা যায়। ২০১১-তে জাপানে সুনামির ফলে দশ হাজারের বেশি মানুষ মারা যান। অথচ মানুষের অসহায় আত্মসমর্পণ করা ছাড়া কোনো ক্ষেত্রে কিছু করণীয় ছিল না। শুধু ২০১১ সালেই জাপানে সুনামির পাশাপাশি নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে ভূমিকম্প, চিনে সামুদ্রিক ঝড়, অস্ট্রেলিয়ায় বন্যা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সামুদ্রিক ঝড় ইত্যাদি নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রত্যক্ষ করা গেছে। এককথায় বিপর্যয়কে প্রতিরোধ করা দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। ভারতেও ২০০১ সালে ভুজের ভূমিকম্প বা ২০০৪-এর সুনামি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ভয়াবহ চেহারাকে প্রকাশ করেছে। আর ২০১১-তে সিকিমে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত জনজীবনের চেহারাটিও আজও ভীতিপ্রদ।।
ছাত্রসমাজের ভূমিকা: বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য রাষ্ট্র 'ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ' তৈরি করেছে। বিপর্যয় পরবর্তী মোকাবিলায় প্রতিটি রাজ্য সরকার ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তর তৈরি করেছে। বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য উন্নত প্রযুক্তিরও ব্যবহার চলছে। কিন্তু এসবের বাইরে সমাজের অন্যতম সচেতন ও উদ্যমী অংশ হিসেবে ছাত্রদেরও কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। ছাত্ররা বিপর্যয়ের সম্ভাব্য কারণগুলির বিষয়ে জনগণকে সচেতন করে তুলতে পারে। বিপর্যয় এলে তাৎক্ষণিক করণীয় বিষয় সম্পর্কেও সাধারণ মানুষকে অবহিত করতে পারে। বিপর্যয় পরবর্তী ত্রাণকাজে ও উদ্ধারকার্যে ছাত্রসমাজ সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে তারা যুক্ত হতে পারে, আবার বিদ্যালয়ের তরফ থেকেও এ বিষয়ে সুসংহত উদ্যোগ নেওয়া যায়।।
উপসংহার: ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে বারবার উঠে দাঁড়িয়ে মানুষই রচনা করেছে বেঁচে থাকার গান। তাই আজও টিকে আছে মানবসভ্যতা।।
ভূমিকা: যে পারিপার্শ্বিক প্রেক্ষাপটে মানুষের তথা জীবজগতের বিকাশ সম্ভব হয়, তা-ই হল তার পরিবেশ। পরিবেশ যদি শিশুর সুস্থ সবলভাবে বেঁচে ওঠার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে স্মরণীয় হয়ে থাকার মতো কোনো জীবন গঠন করা তার পক্ষে সম্ভবপর হবে না। তাই মানবজীবনে পরিবেশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবকে কোনোমতেই অস্বীকার করা যায় না। বৃহত্তর অর্থে পরিবেশকে দু-ভাগে ভাগ করা যায়— ১. সামাজিক পরিবেশ এবং ২. প্রাকৃতিক পরিবেশ।।
মানুষের জীবনে সামাজিক পরিবেশের ভূমিকা: মানুষের বেড়ে ওঠায় সমাজজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। সুস্থ সমাজ, সুস্থ পারিবারিক ও নৈতিক পরিবেশ, সমাজ-আদর্শের স্বচ্ছ ধারণা ব্যক্তিমানুষকে যেমন সমৃদ্ধ করে তোলে, তেমনি তাকে সামাজিকতাবোধে দীক্ষা দেয়। বিকৃত সামাজিক পরিবেশের প্রভাব মানুষের মধ্যে, বিশেষত শিশুদের মধ্যে সুদূরপ্রসারী। 'Education through experience' যদি শিক্ষার সর্বশ্রেষ্ঠ পদ্ধতি হয়, তাহলে সুস্থ সামাজিক পরিবেশের মধ্য দিয়েই তা সার্থক হতে পারে। ভোগবাদী আগ্রাসনের সামনে দাঁড়িয়ে আজ মুহ্যমান মানবসমাজ। অতি শৈশবে ব্যাগ কাঁধে নার্সারিতে ইঁদুরদৌড় শুরু করে যে শিশু— তার জন্য মনুষ্যত্ব বিকাশের কোনো সুযোগ রাখতে ব্যর্থ হয় তার অভিভাবককুল। ক্রমশ স্বার্থপর হয়ে ওঠা এই শিশু একসময় মানসিক বিপন্নতার শিকার হয় এবং পরিণামে নেশাগ্রস্ততা, আত্মহত্যা বা অপরাধমূলক কাজের দিকে পা বাড়ায়। ব্যক্তিমানুষের সার্বিক উন্নতির জন্য প্রয়োজন এক আদর্শ সামাজিক পরিবেশ, যেখানে শিক্ষার সঙ্গে জীবনের সহজ সংযোগ থাকবে, থাকবে সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ ও মানবিক মূল্যবোধ এবং জীবন ও জীবিকার নিশ্চয়তা।।
মানুষের জীবনে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভূমিকা: প্রাকৃতিক পরিবেশ মানুষকে দু-ভাবে সাহায্য করে— প্রথমত, তার জীবনযাপনের সহায়ক শক্তি হয়ে উঠতে পারে সে; দ্বিতীয়ত, পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য করে রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু নগরসভ্যতার আগ্রাসনের সামনে এই প্রকৃতিও আজ বিপন্ন। সভ্যতার অসম বিকাশের ফলে আজ প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, অবলুপ্ত হচ্ছে অসংখ্য প্রজাতির পশুপাখি। জীববৈচিত্র্যের এই বিনাশ প্রকৃতপক্ষে মানুষেরই সর্বনাশ ডেকে আনছে। ভূগর্ভস্থ জলস্তর নেমে যাচ্ছে; দূষণের ব্যাপকতা ক্যানসার, হৃদরোগের মতো ব্যাধিকে মহামারির রূপ দিচ্ছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে মেরুপ্রদেশের বরফ গলে যাচ্ছে। পরিবেশ ও উন্নয়ন বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন (WCED) বলেছে— মানবসভ্যতার বিকাশকে বিপর্যয়হীন করতে হবে। বিপর্যয়হীন টেকসই বিকাশ হচ্ছে সেই ধরনের বিকাশ, যা আমাদের বর্তমানের চাহিদা মেটাবে কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারকে আঘাত করবে না।।
উপসংহার: পরিবেশ সুস্থ না থাকার অর্থ ব্যক্তির অপমৃত্যু, সভ্যতার অপমৃত্যু। প্রকৃতি ও সমাজের সাহায্যে গড়ে ওঠে পূর্ণাঙ্গ মানুষ, যে সভ্যতাকে পরিচালনার অধিকার পায়। পরিবেশ তার ভারসাম্য হারালে যা ঘটবে, তাকে কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায় বলা যায়—
"যদিও পথ আছে— তবু কোলাহলে শূন্য আলিঙ্গনে
নায়ক সাধক রাষ্ট্র সমাজ ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
প্রতিটি প্রাণ অন্ধকারে নিজের আত্মবোধের দ্বীপের মতো
কী এক বিরাট অবক্ষয়ের মানবসাগরে।"
ভূমিকা: ঘটনা ঘটে, ঘটনার অভিঘাতে হয়তো বিচলিতও হই, তারপর স্মৃতির পট থেকে একদিন তা মুছেও যায়। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, একটি ঝড়ের রাত আমাকে এমনভাবে নাড়া দিয়েছিল যে, সেই রাতটির কথা কিছুতেই ভুলতে পারি না। চোখ বুজলেই ছবির মতো স্পষ্ট ভেসে ওঠে সব কিছু।।
ঝড়ের পূর্বাভাস: দিনটা ছিল ২০০৫ সালের ২৩ মে। সকাল থেকেই ছিল সূর্যের প্রচণ্ড তেজ। দুপুরবেলা মাটিতে পা রাখা যায় না, বাইরে তাকালে যেন চোখ ঝলসে যায়। বিকেলের দিকে আকাশে মেঘ জমতে শুরু করল। সবাই বলাবলি করতে লাগল, এবার বৃষ্টি নামবে। কিন্তু বৃষ্টির জন্য প্রতীক্ষার অবসান আর হয় না; বৃষ্টি এল না, কিন্তু শুরু হল প্রচণ্ড গুমোট গরম। নিশ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হয়। দেখতে দেখতে দিন শেষ হয়ে অন্ধকার নেমে এল চারপাশে। একটু তাড়াতাড়িই যেন অন্ধকার নামল সেদিন। আমাদের আর সেদিন সন্ধেবেলায় পড়তে বসা হয়নি। উদ্বেগে উৎকণ্ঠায় কাটল গোটা সন্ধেটা। একসময় রাতের খাওয়াদাওয়ার পর্ব শেষ করে ঘুম আসবে না জেনেও সবাই শুয়ে পড়লাম।।
ঝড়ের তাণ্ডব: কিছুতেই ঘুম আসছিল না, কানে এল একটা সোঁ সোঁ আওয়াজ। বুঝতে পারলাম ঝড় আসছে, কিন্তু ঝড়ের গতিপ্রকৃতি যে কতটা ধ্বংসাত্মক হতে পারে তা তখনও অনুমান করতে পারিনি। দেখতে দেখতে একেবারে ঘরে এসে হানা দিল প্রবল প্রভঞ্জন। হাওয়ার সঙ্গে রাজ্যের ধুলো আর শুকনো পাতা ঢুকতে লাগল খোলা জানলা দিয়ে। কোনো রকমে জানলা বন্ধ করে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। ততক্ষণে বাড়ির অন্যরাও সেখানে জড়ো হয়েছে। প্রবল বেগে বয়ে চলেছে প্রচণ্ড ঝড়। সুপুরি গাছগুলো একেক বার যেন মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে, আবার কিছুটা উঠে দাঁড়াচ্ছে। হঠাৎ মড়মড় শব্দে ভেঙে পড়ল রাস্তার পাশের প্রকাণ্ড শিমুল গাছটা। সেই সঙ্গে শুরু হল তীব্র বিদ্যুতের চমক আর মেঘের গর্জন। প্রচণ্ড শব্দে প্রতিবেশীদের বাড়ির টিনের চাল উড়ে গিয়ে এখানে-ওখানে আছড়ে পড়ল। কাছাকাছি কোথাও ভেঙে পড়ল মাটির দেওয়াল। মানুষের আর্তচিৎকার, গোরু-ছাগলের ডাক আর ঝড়ের গর্জন মিলেমিশে তৈরি হল এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি। এরপরেই শুরু হল মুষলধারে বৃষ্টি।।
ক্ষয়ক্ষতি: দীর্ঘ তাণ্ডবের পর একসময় ঝড় থামল, কিন্তু রেখে গেল ধ্বংসের ক্ষতচিহ্ন। গোটা গ্রামটি একেবারে তছনছ হয়ে গিয়েছিল। বহু মাটির বাড়ি ভেঙে ভূমিসাৎ হয়ে গেছে, খড়ের চাল উড়ে গেছে, উপড়ে পড়েছে অজস্র গাছপালা। পরদিন সকালে জানা গেল, শুধু আমাদের গ্রামই নয়, সমগ্র জেলার এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল এই প্রলয়ঙ্কর ঝড়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।।
উপসংহার: ২৩ মে তারিখের সেই ঝড়ের রাত আমাকে যে কতখানি আতঙ্কিত করে তুলেছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ঝড়-বৃষ্টি প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম হলেও সেই রাতের অভিজ্ঞতা ছিল বিভীষিকাময়। তাই যখনই দুর্যোগের ঘনঘটা দেখি, মনে মনে কেবল একটাই প্রার্থনা জাগে— এমন ধ্বংসলীলাময় রাত যেন কোনোদিন আর ফিরে না আসে।।