Madhyamik Bengali Suggestion 2027 (Wbbse Class 10)(কোনি)
Madhyamik Bengali Suggestion 2027 (WBBSE Class 10)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) ২০২৭ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের জন্য বাংলা প্রথম ভাষার সম্ভাব্য এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলির সম্পূর্ণ তালিকা নিচে দেওয়া হলো। পাঠ্যবই খুঁটিয়ে পড়ার পাশাপাশি এই নির্বাচিত প্রশ্নগুলি প্রস্তুত করলে পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর তোলা সহজ হবে।
মাধ্যমিক বাংলা সাজেশন ২০২৭: সম্পূর্ণ অধ্যায়ভিত্তিক প্রস্তুতি নির্দেশিকা
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE 2027) মাধ্যমিক পরীক্ষায় বাংলা একটি অন্যতম প্রধান ও বেশি নম্বর তোলার মতো বিষয়। সঠিক পরিকল্পনা, প্রশ্নকাঠামো বোঝা এবং বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো নিয়মিত অনুশীলন করলে বাংলায় ৯০ শতাংশের বেশি নম্বর পাওয়া কঠিন নয়। নিচে পাঠ্যক্রমের প্রতিটি বিভাগ থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও প্রস্তুতির বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো।
সেরা প্রস্তুতি কৌশল: মাধ্যমিক বাংলা পরীক্ষায় ভালো নম্বরের জন্য সেরা প্রস্তুতি নির্দেশিকা। গল্প, কবিতা, নাটক, সহায়ক পাঠ ও প্রবন্ধ রচনার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং নম্বর তোলার সহজ কৌশল জানুন এখানে।
কোনি, নদীর বিদ্রোহ, বহুরূপী, পথের দাবী, সিরাজদ্দৌলা এবং নির্মিতির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নাবলি বিশেষভাবে প্রস্তুত রাখুন।
কোনি (সহায়ক পাঠ) — মতি নন্দী
অথবা, "আজ বারুণী গঙ্গায় আজ কাঁচা আমের ছড়াছড়ি।"— বারুণী কি? গঙ্গায় কাঁচা আমের ছড়াছড়ি কেন? বারুণীর গঙ্গা তীরের বর্ণনা দাও।
বারুণী: বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক মতি নন্দীর 'কোনি' উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদ থেকে আলোচ্য অংশটি নেওয়া হয়েছে। বারুণী হল শতভিষা নক্ষত্রযুক্ত কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিতে পুণ্যস্নান দ্বারা পালনীয় পর্ববিশেষ। বর্তমানে এটি লৌকিক উৎসবের মর্যাদা পেয়েছে।।
কাঁচা আমের ছড়াছড়ির কারণ: বারুণী উপলক্ষ্যে পুণ্যসঞ্চয়ের আশায় অনেকে গঙ্গাস্নান করতে আসে। গঙ্গাস্নানের সময় মানুষজন গঙ্গার ঘাটে আম দিয়ে স্নান করার ফলে সেখানে কাঁচা আমের ছড়াছড়ি হয়।।
গঙ্গাতীরের বর্ণনা: বারুণী তিথিতে জল থেকে আম তুলে বাজারে কম দামে বিক্রির লোভে ছোটো ছোটো দলে ছেলেমেয়েরা ঘাটে ভিড় করে থাকে। ছেলের দল কেউ গঙ্গার জলে দাঁড়িয়ে, কেউ বা জলে ভেসে রয়েছে একটু দূরে। একটা আম জলে পড়লেই তাদের মধ্যে হুড়োহুড়ি, কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। আম পেলে পকেটে ঢুকিয়ে রাখে আর পকেট ভরে এলে ঘাটের কোথাও রেখে আসে। পুণ্যসঞ্চয়কারী মানুষরা স্নান করে কাদা মেখে ঘাটে উঠে এসে কেউ কেউ যায় ঘাটের মাথায় বসে থাকা বামুনদের দিকে, যারা পয়সা নিয়ে জামাকাপড় রাখে, গায়ে মাখার জন্য নারকেল তেল বা সরষের তেল দেয় এবং কপালে আঁকে চন্দনের ফোঁটা। কেউ কেউ আবার পথের ভিখারিদের উপেক্ষা করে চলে যায়, কেউ আবার করে না। পথের দু-ধারে নানান জিনিসের দোকান বসে। কেউ কেউ আবার বাজার থেকে ওল বা থোড় বা কমলালেবু কিনে আনে এবং রোদে তেতে ওঠা রাস্তায় তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে বিরক্তির মেজাজে বাড়ি ফিরতে থাকে।।
বিষ্টুচরণ ধরের পরিচয়: 'কোনি' উপন্যাসে মতি নন্দী দেখিয়েছেন বিভিন্ন চরিত্রের অনন্য সমাবেশ। সেইরকমই একটি চরিত্র বিষ্টু ধর। সে পাড়ার একজন বেশ গণ্যমান্য ব্যক্তি। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি সভাপতির পদ অলঙ্কৃত করেন। আসন্ন নির্বাচনে তাঁর ভোটে দাঁড়ানোর ইচ্ছা রয়েছে। পাড়াতে তিনি 'বেষ্টাদা' নামে পরিচিত। অত্যন্ত বনেদি বংশের সন্তান বিষ্টুচরণ আই.এ. পাশ। তাঁর সাতটি বাড়ি রয়েছে এবং বড়োবাজারে ঝাড়ন মশলার কারবার রয়েছে। বছর চল্লিশ বয়সে তাঁর দেহের আয়তন সাড়ে তিন মণ। তাঁর একটি অস্টিন গাড়ি আছে, যেটাতে করে তিনি যাতায়াত করেন। বিষ্টুচরণের শখ হল মালিশওয়ালাকে দিয়ে মালিশ করানো, তাই গঙ্গার ঘাটে বিষ্টুচরণ যায় মালিশ করাতে।।
খাদ্যাভ্যাসের বিবরণ: বিষ্টুচরণের ওজন বেশি হওয়াতে তিনি খাওয়ার লোভে সংবরণ করেছেন এবং ডায়েটিং শুরু করেছেন। আগে তাঁর জলখাবারে ২০টি লুচি লাগত, সেই সঙ্গে ৫০০ গ্রাম ক্ষীর খেতেন। কিন্তু এখন ডায়েটিং করে ৩০০ গ্রাম ক্ষীর এবং জলখাবারে ১৫টা লুচি খান। দুপুরে ভাত খান আড়াইশো গ্রাম চালের আর গরম ভাতের সাথে চার চামচ ঘি খান। বিকেলে দু-গ্লাস মিছরির শরবত আর চারটি কড়াপাকের সন্দেশ খাওয়ার অভ্যাস রয়েছে। রাত্রে বিষ্টুচরণ খান ১২টি রুটি। যদিও তিনি মাছ, মাংস গ্রহণ করেন না কারণ তাঁর বাড়িতে রাধাগোবিন্দের নিত্যপূজা হয়। তিনি মনে করেন খাবার দাবারের লোভ তাঁর একেবারেই নেই।।
অথবা, "আপনার মন হুকুম করতে জানে না তাই শরীর পারল না"— প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তাৎপর্য লেখো।
বক্তা-শ্রোতা: মতি নন্দী রচিত 'কোনি' উপন্যাসে ক্ষিতীশ সিংহ বিষ্টুচরণ ধরকে উদ্দেশ্য করে উক্ত উক্তিটি করেছেন।।
তাৎপর্য ও মন্তব্যের কারণ: ক্ষিতীশ সিংহের সঙ্গে গঙ্গার ঘাটে সাক্ষাৎ হয় সাড়ে তিন মণ ওজনের দেহের মালিক বিষ্টুচরণ ধরের। তাঁর বিপুল দেহ ও মালিশের বিচিত্র ভঙ্গি দেখে ক্ষিতীশবাবু তাঁকে আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সচেতন করে দিয়ে বলেন যে এই অতিরিক্ত মেদবহুল ওজন হার্টের ক্ষতি করতে পারে। বিষ্টু ধর একথা শুনে ভয় পেয়ে নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আতঙ্কিত হয়ে পড়লে ক্ষিতীশ সিংহ তাঁকে বলেন যে, তিনি অনেক বড়োলোক হতে পারেন, কিন্তু চার লক্ষ টাকা খরচ করেও নিজের শরীরটাকে নিজের অনুগত দাসে পরিণত করতে পারবেন না। কারণ ভালো ভালো খাবার খেয়ে শুধুমাত্র শরীরের আয়তন বেড়েছে, কিন্তু মনের বল একটুও বাড়েনি।।
ক্ষিতীশ তাঁর ডান কনুই শরীরের সঙ্গে লাগিয়ে পিস্তল ধরার ভঙ্গিতে হাতটা সামনে বাড়িয়ে বিষ্টু ধরকে তা নামাতে বলেন। বিষ্টু ধর কয়েক বার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। তখন ক্ষিতীশবাবু তাঁকে বলেন যে, জোর বলতে শুধু গায়ের পেশির জোর বোঝায় না, মনের জোরেই সব হয়। আর এই মনের জোর আসে প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি থেকে। শরীর যতটা পারে, তার থেকে বেশি যদি শরীরকে দিয়ে করানো যায় তবে ইচ্ছার জোর বাড়তে থাকে। বিষ্টু ধর যেহেতু শরীরকে দিয়ে হুকুম মানাতে ব্যর্থ, তাই তিনি রোগা শরীরের ক্ষিতীশের সামান্য হাত নামাতে ব্যর্থ হন।।
অথবা, ক্ষিতীশবাবুর দোকানের বর্ণনা দাও।
প্রজাপতি: মতি নন্দীর 'কোনি' উপন্যাস থেকে আলোচ্য অংশটি নেওয়া হয়েছে। 'প্রজাপতি' হল ক্ষিতীশ সিংহের একটি কাপড়ের টেলারিং-এর দোকান।।
প্রজাপতির পূর্ব অবস্থা: প্রজাপতির পূর্বের নাম ছিল 'সিনহা টেলারিং'। ক্ষিতীশ সিংহের আমলে দোকানটি ঠিকমতো ডানা মেলতে পারেনি অর্থাৎ দোকান থেকে কোনো লাভ হত না, বরং সবসময় লোকসান হত। পূর্বে দুটি দর্জি জামা-প্যান্ট তৈরি করত আর দেয়াল আলমারিতে ছিল কিছু সিন্থেটিক কাপড়। ক্ষিতীশবাবু সাঁতারের নেশায় দিনে ঘণ্টা দুয়েকও সময় দিতে পারতেন না দোকানে। ফলে দেখা গেল আলমারির কাপড় অর্ধেকের বেশি অদৃশ্য হয়েছে, দোকানের ভাড়া বাকি পড়েছে চার মাস এবং লাভের বদলে লোকসান চরমে উঠেছে।।
প্রজাপতির বর্তমান অবস্থা: এই চরম দুরবস্থার সময়ে দোকানের পূর্ণ দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেন ক্ষিতীশের স্ত্রী লীলাবতী। টেলারিং-এর ডিপ্লোমাধারী দুই মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে নিজের গয়না বন্ধক দিয়ে দোকানটি ঢেলে সাজান তিনি। নতুন নাম দেন 'প্রজাপতি'। পুরুষদের পোশাক তৈরি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে শুধুমাত্র মেয়েদের ও বাচ্চাদের আধুনিক পোশাক তৈরি শুরু করেন এবং কোনো পুরুষ কর্মচারী রাখেননি। চার বছরের মধ্যে দোকান বিপুল লাভের মুখ দেখে, লীলাবতী অর্ধেকের বেশি গয়না ছাড়িয়ে আনেন। অর্ডারের চাপে আগে তিন দিনে ডেলিভারি হলেও এখন দশ দিনের আগে কাজ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না এবং দোকানের জায়গা কম পড়ায় হাতিবাগানে বড়ো ঘরের সন্ধান করতে হচ্ছে।।
বক্তা: মতি নন্দীর 'কোনি' উপন্যাসে আলোচ্য অংশের বক্তা হলেন জুপিটার সুইমিং ক্লাবের প্রধান প্রশিক্ষক ক্ষিতীশ সিংহ।।
অভিযোগসমূহ: হরিচরণবাবুরা সমবেতভাবে জানিয়েছিলেন যে জুপিটারের সদস্যরা কেউ আর ক্ষিতীশ সিংহকে চায় না, কারণ তাঁরা ক্ষিতীশের কঠোর ব্যবহারে অতিষ্ঠ। তাঁর বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল ছেলেমেয়েদের মন-মেজাজ ও আবেগ বোঝার ক্ষমতা তাঁর নেই। ক্লাব কমিটির আনা সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলি ছিল—
(i) জুনিয়র ছেলেদের সামনেই শ্যামলকে আমেরিকার বারো বছরের মেয়েদের টাইমিংয়ের সাথে তুলনা করে অপমান করেছেন।
(ii) রেকর্ডধারী সাঁতারু গোবিন্দকে বলেছেন কান ধরে জুপিটার থেকে বের করে দেবেন।
(iii) সুহাস অসুস্থতার কারণে দশ দিন ক্লাবে না আসায় ক্ষিতীশ তাঁর বাড়ি গিয়ে সুহাসের বাবাকে যা-তা কথা শুনিয়ে এসেছেন।
(iv) অমিয়া আর বেলা জুপিটার ছেড়ে প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাপোলো ক্লাবে চলে গেছে শুধুমাত্র ক্ষিতীশের জন্যই; কারণ তিনি তাদের চুল ছোটো করে কাটতে নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং পুরুষদের মতো ভারী বারবেল নিয়ে শরীরচর্চা করতে বাধ্য করতেন।
এইসব মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত অভিযোগ তুলে ষড়যন্ত্র করে ক্ষিতীশ সিংহকে চিফ ট্রেনার পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল।।
মাধ্যমিক বাংলা: অন্যান্য সমস্ত অধ্যায়
ওরা: মতি নন্দীর 'কোনি' উপন্যাস থেকে নেওয়া আলোচ্য অংশে 'ওরা' বলতে জুপিটার ক্লাবের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী সাঁতার ক্লাব 'অ্যাপোলো'কে বোঝানো হয়েছে।।
প্রসঙ্গ ও তাৎপর্য: আলোচ্য উক্তিটির বক্তা ক্ষিতীশ সিংহ। ক্ষিতীশবাবুর সর্বক্ষণের অনুগামী ভেলো যখন শোনেন যে নোংরা চক্রান্ত করে জুপিটার ক্লাব থেকে ক্ষিতীশকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তখন তিনি ক্ষিতীশবাবুকে পরামর্শ দেন সমস্ত অভিমান ভুলে অ্যাপোলো ক্লাবে যোগ দিয়ে জুপিটারকে উচিত শিক্ষা দিতে। কিন্তু ক্ষিতীশবাবু সেই প্রস্তাবে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এই উক্তিটি করেন।।
জুপিটার ক্লাবের সঙ্গে ক্ষিতীশ সিংহের দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের নাড়ির যোগ। কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির ষড়যন্ত্রের কারণে নিজের আজন্মের ভালোবাসার ক্লাবকে শত্রু মনে করা তাঁর নৈতিকতায় বাঁধে। এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে ক্ষিতীশবাবুর ক্লাবের প্রতি অকৃত্রিম আনুগত্য, নিঃস্বার্থ নিষ্ঠা এবং আত্মমর্যাদাবোধের গভীর মহত্ত্ব অত্যন্ত উজ্জ্বলভাবে ধরা পড়ে।।
ভূমিকা: কথাসাহিত্যিক মতি নন্দীর কিশোর উপন্যাস 'কোনি'-র নামচরিত্র ও প্রধান চালিকাশক্তি হল কোনি (কনকচাঁপা পাল)। জীবনসংগ্রাম ও ক্রীড়াক্ষেত্রে হার না মানা মানসিকতার এক অনন্য প্রতীক সে।।
(i) কঠোর জীবনসংগ্রাম: চরম দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারের মেয়ে কোনি। চেহারা ও চালচলন ডানপিটে ছেলেদের মতো। কোনো প্রতিকূলতাতেই সে পিছিয়ে যায় না— তা গঙ্গার জলে কাঁচা আম কুড়োনোর লড়াই হোক, রবীন্দ্র সরোবরের সাঁতার প্রতিযোগিতা হোক কিংবা অবিরাম ২০ ঘণ্টার হাঁটার লড়াই হোক।।
(ii) পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা: দাদা কমলের অকালমৃত্যুর পর সংসারের ক্ষুধা নিবারণে ট্রেনিংয়ের শত ক্লান্তি সত্ত্বেও সে লীলাবতীর 'প্রজাপতি' দোকানে কাজে যোগ দেয়। ক্ষিতীশ তার পুষ্টিকর খাবারের জন্য যে টাকা বরাদ্দ করেছিলেন, তা নিজে না খেয়ে পরিবারের চাল কেনার জন্য সে বাড়িতে নিয়ে যেতে চায়।।
(iii) প্রখর আত্মসম্মানবোধ: দারিদ্র্যের মধ্যেও কোনির আত্মমর্যাদাবোধ প্রখর। চিড়িয়াখানায় বালিগঞ্জের বড়ো ঘরের মেয়ে হিয়া মিত্রের উপেক্ষা এবং পরে দেওয়া জল সে প্রবল ক্ষোভে ফিরিয়ে দেয়। অপমানকে শক্তিতে রূপান্তর করাই ছিল তার স্বভাব।।
(iv) অদম্য জেদ ও পরিশ্রম: ক্ষিতীশের কঠোর ও নির্মম অনুশাসনে দিনরাত অবিশ্রান্ত অনুশীলন করে সমস্ত প্রতিকূলতা ও ষড়যন্ত্রকে পরাস্ত করে জাতীয় সাঁতার চ্যাম্পিয়নশিপে জয়ী হয়ে সে প্রমাণ করে যে ইচ্ছাশক্তিই শেষ কথা।।
দুচোখ জলে ভরে ওঠার কারণ: রবীন্দ্র সরোবরে আয়োজিত এক মাইল সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিল শ্যামপুকুর বস্তির দরিদ্র ঘরের মেয়ে কোনি। কোনি তার বড়দা কমলকে কথা দিয়েছিল যে সে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়ে দেখাবে। সেই ভরসায় দাদা ধারদেনা করে বারো টাকা দিয়ে কোনিকে আধুনিক সাঁতারের কস্টিউম কিনে দিয়েছিলেন। কিন্তু যথাযথ টেকনিক ও প্রশিক্ষণের অভাবে ধনীর দুলালী হিয়া মিত্রের কাছে কোনি পরাজিত হয়। দাদাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হওয়ার তীব্র গ্লানি ও যন্ত্রণায় কোনির বুক ভেঙে যায়। ঠিক সেই সময়ে তীরে দাঁড়িয়ে ক্ষিতীশ সিংহের কড়া বিশ্লেষণ ও সাঁতার শেখানোর সহানুভূতিশীল প্রস্তাব শুনে অভিমান ও কান্নায় কোনির চোখ জলে ভরে উঠেছিল।।
পরবর্তী ঘটনা: এই কান্নাই কোনির জীবনে এক ঐতিহাসিক বাঁক এনে দেয়। ক্ষিতীশ সিংহ কোনির সুপ্ত প্রতিভাকে চিনে নিয়ে তাকে সাঁতারু তৈরির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর ক্ষিতীশের জহুরির চোখ ও কঠোর প্রশিক্ষণে অবহেলিত বস্তির মেয়ে কোনি ধীরে ধীরে জাতীয় স্তরের শ্রেষ্ঠ চ্যাম্পিয়ন সাঁতারু হয়ে ওঠার পথে যাত্রা শুরু করে।।
বক্তার মানসিকতা: ক্ষিতীশ সিংহ দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর ধরে জুপিটার ক্লাবের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছিলেন। কিন্তু সংকীর্ণ দলাদলি ও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তাঁকে ক্লাব থেকে বিতাড়িত হতে হয়। পরবর্তীকালে বস্তির দরিদ্র কন্যা কোনিকে সাঁতারু হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তিনি যখন জুপিটারে জায়গা পান না, তখন এক অনন্য সাঁতারু গড়ার তাগিদে তিনি বাধ্য হয়ে জুপিটারের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাপোলো ক্লাবের দরজায় গিয়ে দাঁড়ান।।
অ্যাপোলোর গেটে পা দেওয়ার মুহূর্তে ক্ষিতীশের সংস্কার ও ভালোবাসার জুপিটারের স্মৃতি তাঁর বুকে তীব্র মোচড় দিয়ে ওঠে। নিজেকে তাঁর বিশ্বাসঘাতক বা 'নেমোকহারাম' মনে হতে থাকে। কিন্তু একজন নিষ্ঠাবান গুরুর কাছে কোনো ক্লাবের রাজনীতির চেয়ে একটি অসামান্য প্রতিভার বিকাশ ঘটানো অনেক বড়ো ধর্ম। তাই তিনি নিজের সমস্ত ব্যক্তিগত অভিমান ও আত্মগ্লানি বিসর্জন দিয়ে শর্ত রাখেন— কোনি সাঁতার কাটবে অ্যাপোলোর হয়ে, কিন্তু ক্ষিতীশের মন আজীবন পড়ে থাকবে সেই ভালোবাসার জুপিটারেই। এই দ্বন্দ্বে এক মহান, আত্মত্যাগী ও খাঁটি ক্রীড়াগুরুর ভাবমূর্তি ফুটে ওঠে।।
বক্তা ও শ্রোতা: মতি নন্দীর 'কোনি' উপন্যাসে ক্ষিতীশ সিংহ ধনী বিষ্টুচরণ ধরের প্রশ্নের উত্তরে কোনিকে দেখিয়ে এ কথা বলেছিলেন।।
ভবিষ্যৎ বলার কারণ: জুপিটার সুইমিং ক্লাব থেকে অপমানিত হয়ে বহিষ্কৃত হওয়ার পর ক্ষিতীশের সমগ্র জীবনের সাধনা ও পরিচয় ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল যে তিনি নাকি আধুনিক সাঁতারু তৈরির অযোগ্য। ঠিক সেই চরম নৈরাশ্যের মুহূর্তে গঙ্গার ঘাটে তিনি আবিষ্কার করেন দরিদ্র, ক্ষিপ্র ও অদম্য জেদি মেয়ে কোনিকে। ক্ষিতীশ বুঝেছিলেন, এই অবহেলিত মেয়েটিকে কঠোর পরিশ্রমে বেঙ্গল ও ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন বানাতে পারলেই ক্লাব রাজনীতির নোংরা ষড়যন্ত্রের যোগ্য জবাব দেওয়া যাবে। কোনির সাঁতারের জয়ই হবে তাঁর প্রশিক্ষক জীবনের চূড়ান্ত সার্থকতা ও পুনর্জন্ম। তাই কোনি নিছক এক ছাত্রী ছিল না, সে ছিল ক্ষিতীশের হারানো সম্মান পুনরুদ্ধারের একমাত্র আশা ও স্বপ্ন— অর্থাৎ তাঁর নিজস্ব 'ভবিষ্যৎ'।।
কমল: মতি নন্দীর 'কোনি' উপন্যাসের অন্যতম ট্র্যাজিক চরিত্র হল কমলেশ (কমল)। সে ছিল কোনির বড়দা। একসময় অ্যাপোলো ক্লাবে সাঁতার কেটে বড়ো সাঁতারু হওয়ার স্বপ্ন দেখত কমল। কিন্তু পিতার অকালমৃত্যুর পর পরিবারের সাতটি পেটের অন্নের সংস্থানে সেই স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে তাকে জীবিকার কঠোর সংগ্রামে নামতে হয়।।
করুণ স্বরের কারণ: নিজের না-হওয়া সাঁতারুর স্বপ্ন কমল ছোটো বোন কোনির মধ্যে দেখতে পেয়েছিল। ক্ষিতীশ যখন কোনির প্রশিক্ষণের দায়িত্ব নেন, তখন কমলের হৃদয়ে আশার আলো জ্বলে ওঠে। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে কমল দুরারোগ্য যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে। সংসারের খাদ্যের জোগান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে কোনিকে মাত্র ষাট টাকা বেতনে সুতোর কারখানায় কাজে পাঠাবার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। নিজের তীব্র অসুস্থতা, চরম দারিদ্র্য এবং চোখের সামনে বোনের ক্রীড়াজীবনের অপমৃত্যু দেখার চরম অসহায়তা থেকেই ক্ষিতীশের সামনে কমলের কণ্ঠস্বর এক করুণ ও হৃদয়বিদারক আর্তনাদের মতো শুনিয়েছিল।।